{{'FixedLabel.Login' | translate }}
{{'FixedLabel.Welcome' | translate }}
শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জ শহরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সুধীজন পাঠাগার।
আমলাপাড়ায় সূচনা (১৯৬৪)
বঙ্গবন্ধু রোডের সমবায় ভবন
নিজস্ব জমিতে একতলা ভবন
বর্তমান তিনতলা ভবন
১৯৬৪ সালের একুশের মাসের ২ তারিখ আমলা পাড়ার হরকতান ব্যানার্জি রোডে (এখন আমলা পাড়া রোড) গণপাঠাগারের শুরু হলো। হাজি রহমত উল্লাহর একটি বাড়িতে একটি ঘর ভাড়া পাওয়া গেল মাসে ৫০ টাকা করে। ছোট সেই ঘরে স্বল্পসংখ্যক পাঠাগারের র্যাকে ১০টি মোটে বই, একটি করে আলমারি, টেবিল ও ১০টি চেয়ার নিয়ে রাতে তন্দ্রার জন্য কিছু নেই। গ্রামের ফলে দলের দুটি হারিকেন বাতি হলো সম্বল। সেই থেকে এসে আজ পুরোনা।
নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রায় সেরা পাবলিক লাইব্রেরি গণপাঠাগার হয়েছে। বিভিন্ন পাঠাগারগুলোতে বাংলা, ইংরেজি ভাষা শিক্ষার পাঠচক্রের জন্য যে সেলসম্যান বই সংগ্রহ করেছেন তারা এখন বাংলা, ইংরেজি ভাষার সাহিত্য, কবিতা, প্রবন্ধ, বিজ্ঞান, ধর্ম, খেলাধুলা, সমাজ ও রাজনীতি এই বইগুলোও উঠেছে। উপন্যাস ও ইংরেজি ভাষার বইও রয়েছে। পাঠাগারের নিবন্ধন হিসেবে নিজস্ব কালেকশনের বই মোট ৪৮ হাজার। কোনো শহরে বেসরকারি গণগ্রন্থাগারের কালেকশনে এত সংখ্যা বই সম্ভবত আর নেই। বাংলা বই – মোট ৩৩ হাজার। ইংরেজি বই আছে ৮ হাজার। প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছে আরও অনেক। গেল বছর তারা মোট সাড়ে ছয় লাখ টাকার বই কিনেছেন। এ বছর সুধীজন পাঠাগারের মোট পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের বই কেনার জন্য বরাদ্দ আছে।
শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা ছোট্ট, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও ব্যবসায়বান্ধব শহর নারায়ণগঞ্জ। নদীর হাওয়ায় জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা এই শহরের সকলেই সংস্কৃতিমনা; সবার ভেতর ছিল শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছা।
এই শহরে জন্ম নেওয়া একদল যুবক, যারা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ও নিজ নিজ পেশায় সুপরিচিত, ভাবলেন এখানে একটি পাঠাগার গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন। চলতে থাকল আলাপ-আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা। তাদের মধ্যে যারা এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর ছিলেন, তারা হলেন রফিক (জনাব ফজলে রাব্বি), ফাইজুর (জনাব ফয়জুর রহমান), ভূঁইয়া সাহেব (জনাব সাইদুর রহমান ভূঁইয়া), জনাব আব্দুল মতিন, জনাব ওসমান গনি ও জনাব আশরাফ। তাদের সাথে মাঝেমধ্যেই যোগ দিতেন আরও অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী।
প্রায় একই সময়ে আরেকদল কিশোর গড়ে তুলেছে একটি পাঠাগার; তারা মূলত ছাত্র। এই শহরের সুশীল ও বিত্তবান পরিবারের সন্তান তারা। তারা হলেন ইসহাক, তমিজ, মনু ও সুনীল।
প্রথম প্রজন্মের সেই যুবকরা, যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত, তাদের দরকার ছিল কাজ করতে পারা কিছু কর্মীর; আর দ্বিতীয় প্রজন্মের সেই স্বপ্নাতুর কিশোররা, যারা ইতিমধ্যে পাঠাগার গঠন করে ফেলেছে, তাদের দরকার ছিল সাংগঠনিকভাবে পরিণত ও দক্ষ পথপ্রদর্শকের।
ছোট্ট এই শহরে তখন সকলেই ছিল আত্মীয়-সম। তাই এই যুবক ও কিশোর প্রজন্ম যাদের চিন্তাভাবনায় ছিল শিক্ষা বিস্তার ও সাহিত্যচর্চা—তাদের মিলনে জন্ম নিল এক পরিবার, যে পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে চলল হাত ধরাধরি করে তাদের স্বপ্নের পাঠাগার গড়ে তোলার জন্য।
সুধীজন পাঠাগারের ক্রমোন্নতি বর্তমান সময় পর্যন্ত চারটি স্তরে বিভক্ত:
(১) আমলাপাড়ায় সুধীজন পাঠাগার: প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় জনাব ফজলে রাব্বি সাহেবের বাসায়। সেই দিনক্ষণের তারিখ মনে নেই; তখনও ঠিক হয়নি পাঠাগারের নাম। জনাব সাইদুর রহমান সাহেবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিল আমাদের সেই কিশোরেরা। সেই সভায় অতিথি হয়ে আসলেন অধ্যাপক নুরুল হকসহ আরও বেশ কয়েকজন উৎসাহী। উক্ত সভায় পাঠাগারের নাম নির্ধারিত হয় সর্বসম্মতিক্রমে সুধীজন পাঠাগার’ এবং এর গঠনতন্ত্র প্রণয়নের ভার প্রদান করা হয় অধ্যাপক নুরুল হক সাহেবের ওপর।
অধ্যাপক নুরুল হক গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরি করে ফেলেন, কিন্তু আলাপ-আলোচনা করার মতো কোনো বসার জায়গাও ছিল না। সেই কিশোরদের ভেতর থেকে একজন জনাব তমিজ উদ্দিন, যার বাবা ব্যবসায়ী জনাব হাজী রহমতুল্লাহ তখন আমলাপাড়া ‘রজনী নিবাস’-এর মালিক ছিলেন। বিশাল সেই বাড়িতে তমিজ উদ্দিন ব্যবস্থা করেছিলেন বসার জন্য এবং সেখানেই নিয়মিত আলোচনা চলত এই গঠনতন্ত্র প্রণয়নের ওপর।
অবশেষে ১৯৬৪ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি রজনী নিবাসে ২৫ জন সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে গঠনতন্ত্র গৃহীত হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সুধীজন পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ পর্যন্ত যা হলো তা হচ্ছে কাগজ-কলমে; বাস্তবের পাঠাগার তখনও হয়নি। সম্বল হলো মনু, ইসহাক, তমিজ উদ্দিন ও সুনীলদের পাঠাগারের বই ও শেলফ দুটি। কিন্তু বই ও শেলফ রাখার জায়গা বা বসার জায়গাও ছিল না। সবার অনিশ্চয়তা পেছনে ফেলে তিন কিশোর হরকান্তি ব্যানার্জি রোডে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ আয়রন ওয়ার্কশপ-এর গেটের সাথে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে সবার মুখে হাসি ফোটায়।
কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ওই জায়গার মালিকের অসহযোগিতার কারণে সেখানে তিন দিনের বেশি পাঠাগার রাখা গেল না। আবারও ভরসা সেই কিশোরেরা। তারা জনাব হাজী রহমতুল্লাহ সাহেবের আমলাপাড়ার আর. কে. গুপ্ত রোডের চার রাস্তার মোড়ে একটি ছোট টিনের ঘর ৫০ টাকা মাসিক ভাড়ায় ঠিক করে ফেলল; সেখানেই সুধীজন পাঠাগারের সূচনা।
(২) বঙ্গবন্ধু রোডের সমবায় ভবনে: একটা সময় বোঝা গেল, সুধীজন পাঠাগারকে পরিপূর্ণ করতে গেলে এই ছোট্ট ঘরটি উপযোগী নয়। হোসেন জামাল ততদিনে পুরোদমে কাজ শুরু করেছেন। বইপ্রেমিক, পড়ুয়া, বিত্তবান ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় হোসেন জামাল শক্ত হাতে হাল ধরে হয়ে ওঠেন কাণ্ডারি। হোসেন জামাল পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার কারণে বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক খান বাহাদুর জসিমউদ্দীনকে নানা বলে ডাকতেন। তিনি ছিলেন তদানীন্তন সমবায় ব্যাংকের পরিচালক। তিনিই সমবায় ভবনের দুটি কামরা স্বল্প ভাড়ায় সুধীজন পাঠাগারকে ব্যবহারের ব্যবস্থা করে দেন। ওখানে যাওয়ার পর পাঠাগারের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। পরিবেশটাও ভালো ছিল। হোসেন জামালের অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিষ্ঠার কারণে পাঠাগারের কার্যক্রম যথেষ্ট বেড়ে যায়। তাঁর ওই পরিশ্রমের মূল্য আমরা কেউ দিতে পারব না। হোসেন জামালের সাথে সব কাজে সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে থাকল সেই তরুণদের মধ্যে জনাব মোহাম্মদ ইসহাক, জনাব আখতারুজ্জামান মনু ও জনাব শওকত আলী; এবং নতুনভাবে যুক্ত হলো হোসেন জামালের ছোটবেলারসাথি জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদ। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাঠাগারটি লুট হয়, অনেক বই হারিয়ে যায়। কিন্তু সকলের চেষ্টায় তা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
(৩) নিজস্ব জমিতে স্থানান্তর: হোসেন জামাল যেহেতু প্রধান সংগঠক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছিলেন, তিনি পরিকল্পনা করেন পাঠাগারের জন্য নিজস্ব জমি ও ভবনের। তাঁর পরিকল্পনায় পৌরসভার সাথে যোগাযোগ করা হয় এবং চলতে থাকে নিজস্ব জমি পাওয়ার চেষ্টা। পৌরসভা থেকে প্রথমে একটি জমি প্রদান করা হয় বাগে জান্নাত মসজিদের পশ্চিমে নিচু জমিতে, যেখানে বালু ও ইটের খোয়া ফেলা শুরু হলো। কিন্তু সোনালী ব্যাংকের মালিকানার দাবিতে বরাদ্দকৃত জায়গাটি পাওয়া যায়নি। হোসেন জামাল তাঁর জীবদ্দশায় সেই জায়গায় সাইনবোর্ড লাগিয়ে সেই দিনই মারা গেলেন। পাঠাগার হারাল তার একনিষ্ঠ কর্মীকে।
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও স্বপ্নদ্রষ্টা হোসেন জামালের মৃত্যুর পর সকলেই প্রথমে হতাশায় ডুবে গেলেও বন্ধু হোসেনের ফেলে যাওয়া পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে সকলেই উঠেপড়ে লাগল। এবার সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেন জনাব ইসহাক; সাথে রইলেন অধ্যক্ষ হামিদা আলী, জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদ, জনাব শওকত আলী, জনাব শরীফ সারোয়ার ও বেগম সুফিয়া নেয়ামত উল্লাহ। সকলের অক্লান্ত চেষ্টায় অবশেষে ১৯৭৭ সালের জুন মাসে পাওয়া গেল একখণ্ড জমি, যার ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সুধীজন পাঠাগার ভবন। সেই সময় পরিচালক ছিলেন বেগম সুফিয়া নেয়ামত উল্লাহ এবং কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন জনাব শরীফ সারোয়ার। জনাব মোহাম্মদ ইসহাক বরাদ্দপত্র নিয়ে গেলেন মহকুমা প্রশাসক ইমাম হোসেনের কাছে এবং তিনি ডিসি সাহেবের কাছ থেকে ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করার জন্য ১,২৫,০০০.০০ টাকার ব্যবস্থা করলেন। ভবনের নকশা করেন হোসেন জামালের ভগ্নিপতি জনাব মামুন সাহেব এবং সুধীজন পাঠাগার’ নামের শব্দ দুটির নতুন ফন্ট বা স্টাইল তৈরি করে দেন চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু বকর আলভি। এই প্রতিটি কাজের জন্য জনাব ইসহাক পাঠাগারের ইতিহাসে চির-অম্লান হয়ে থাকবেন। ১৯৭৮ সালে স্থাপিত হয় ১তলা ভবন। একই সালে রাস্তার ওপাশে সমবায় ভবন থেকে বইপত্র নিয়ে এসে পাঠাগার চালু করা হয়। নানান স্থান থেকে যেসব সাহায্য পাওয়া গিয়েছিল, একতলা ভবনের কাজ করতেই সব ফুরিয়ে যায়। বাইরে থেকে একটি চমৎকার ভবনে লাইব্রেরি চলছে দেখা গেলেও আসলে খুব কষ্ট হচ্ছিল পাঠাগার পরিচালনায়। সেই সময় সিদ্ধান্ত হয় একতলা ভাড়া দিয়ে তার টাকা দিয়ে দোতলা করা এবং একতলার ভাড়া দিয়ে পাঠাগার পরিচালনা করা।
(৪) চতুর্থ প্রচেষ্টা এবং বর্তমান অবস্থান: জনাব শওকত আলী ইসলামী ব্যাংকের সাথে কথা বলেন, কিন্তু তারা আগ্রহ না দেখালে জনাব সালাহউদ্দিন সাহেব ব্যাংকের সাথে কথা বলে সব চূড়ান্ত করেন এবং একতলার ভাড়ার চুক্তি সম্পাদন করেন। ঠিক সেই সময় পাঠাগারের শুভাকাঙ্ক্ষী ও কাসেম জামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হুমায়ূন কাশেম জানান যে, এক সময়ের ডিসি ড. এ এস এম শওকত আলী (যিনি ১ম তলা নির্মাণের সময় ১,২৫,০০০.০০ টাকা অনুদানের ব্যবস্থা করেছিলেন) তিনি এখন কৃষি ব্যাংকের এম.ডি হয়েছেন; তাই তাঁর সাথে দেখা করলে আরও ভালো কিছু পাওয়া যাবে। হুমায়ূন কাশেম ওনার সাথে কথা বললে উনি সম্মত হন যে ১ম তলায় শাখা স্থানান্তর করা হবে, তবে দোতলায় আঞ্চলিক কার্যালয়ের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। জনাব শওকত আলী সাহেবের সদিচ্ছায় কৃষি ব্যাংক পাঠাগারকে অগ্রিম হিসেবে ৭,২০,০০০ টাকা প্রদান করে, যা দিয়ে দোতলার কাজ শেষ করে তৃতীয় তলার আংশিক কাজ করা যাবে। সেই সময় কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন জনাব আল আমিন। কাসেম জামালকে আহবায়ক করে একটি ভবন নির্মাণ সাব-কমিটি গঠন করা হয়। সদস্যরা হলেন জনাব মোহাম্মদ ইসহাক, জনাব শওকত আলী, জনাব রহমান কিব্রিয়া, জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদ, জনাব মুহাম্মদ আইউব এবং পদাধিকার বলে জনাব আল আমিন ও শ্রী করুণাময় গোস্বামী। ভবন নির্মাণের কাজে সার্বক্ষণিক তদারকির কাজে স্বতঃস্ফর্তভাবে এগিয়ে আসেন কর্মাধ্যক্ষ আল আমিন। ভবন নির্মাণের কাজে জনাব আল আমিন যেভাবে পরিশ্রম করেছেন, তা এই ভবনের প্রতিটি গাঁথুনির সাথে চিরকাল জড়িয়ে থাকবে।
১৯৮৬ সালের ৪ অক্টোবর কৃষি ব্যাংক ১ম তলায় চলে আসে; ততদিনে অবশ্য দোতলার কাজ শুরু করা হয়। সেই সময়টাতে সিঁড়ির নিচে খুব সীমিত আকারে পাঠাগারের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এটি ছিল শুধু পাঠাগার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর দোতলার নির্মাণকাজ শেষ হয় এবং ১৯৮৭ সালের ১লা জানুয়ারি আঞ্চলিক কার্যালয় তাদের যাত্রা শুরু করে।
পাঠাগারের জন্য তৃতীয় তলা নির্মাণের জন্য যে অর্থ অবশিষ্ট ছিল, তা দিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করার সাথে সাথে কাসেম জামাল বাকিতে বিভিন্ন জায়গা থেকে নির্মাণসামগ্রীর ব্যবস্থা করেন। কাসেম জামালের শ্বশুর জনাব আক্কাস আলি সাহেব সম্পূর্ণ ইট প্রদান করেন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রীতা ট্রেডার্স -এর স্বত্বাধিকারী মোজাফফর কন্ট্রাক্টর সাহেবের ছেলে জনাব ওবায়দুল্লাহ বাকিতে সিমেন্ট ও রড দিতে রাজি হলে নির্মাণকাজ চলতে থাকে। ১৯৮৭ সালের মার্চ মাসে নেট ফিনিশিংহীন মেঝে, গ্রিলহীন জানালা ও পলেস্তারা ছাড়াই পাঠাগারের কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পরিচালক সদস্য জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদ পাঠাগার সুহৃদ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করলে অবস্থার বেশ উন্নতি ঘটে। কিন্তু মোট ভাড়া থেকে ৭৫% অর্থ সমন্বয় করাতে পাঠাগার চালাতে কষ্ট হওয়ায় জনাব কাশেম হুমায়ূন আবার জনাব শওকত আলী সাহেবের সাথে দেখা করলে তিনি ৫০% সমন্বয় করার নির্দেশ প্রদান করে পাঠাগার পরিচালনায় সহযোগিতা করেন। তাঁর এই মহৎ হৃদয়ের ভালোবাসা ও সাহায্য কখনো ভুলবার নয় এবং পাঠাগারের ক্রমোন্নতির সাথে তাঁর এই অবদান চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে।
এরপর আর পাঠাগারকে পিছনে ফিরে দেখতে হয়নি। পাঠাগার সাবলীল গতিতে এগিয়ে চলছে নিজ সক্ষমতায়। সুধীজন পাঠাগারের সাথে যারাই জড়িত ছিলেন বা আছেন, তারা সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করে গেছেন বা যাচ্ছেন; পদের মোহ কারোরই ছিল না। এজন্যই সুধীজন পাঠাগারের এত সমৃদ্ধি।
সদস্যরা ১৫ দিনের জন্য বই নিতে পারেন।
স্কুল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রন্থসেবা।
আবৃত্তি, সংগীত, চিত্রাঙ্কন, বইমেলা।
বইপড়া প্রতিযোগিতা ও কর্মশালা।
ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রকাশনা।
মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের সহায়তা।
সুধীজন পাঠাগার একটি জ্ঞানভিত্তিক ও সংস্কৃতিমনস্ক প্রতিষ্ঠান, যার মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে শিক্ষার প্রসার, পাঠ অভ্যাস গড়ে তোলা ও সচেতন নাগরিক তৈরি করা। এটি শুধু বই পড়ার জায়গা নয় বরং একটি প্রাণবন্ত সংস্কৃতি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
বর্তমানে সুধীজন পাঠাগারের সংগৃহীত বইয়ের সংখ্যা ৪৫ হাজারের বেশি। সকল সদস্য বই ১৫ দিনের জন্য ইস্যু করে নিতে পারেন। দুই ধরনের সদস্য রয়েছে ছাত্র/ছাত্রী সদস্য ও সাধারণ সদস্য। সদস্য পদ গ্রহণের জন্য শুধুমাত্র নাম মূল্যে একটি ফি ধার্য করা আছে যা শিক্ষার্থীদের ৮৫ টাকা এবং সাধারণ সদস্যের জন্য ১৪৫ টাকা। দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা কোন রকম ফি প্রদান ব্যতীত পাঠাগারের সদস্য পদ গ্রহণ করতে পারে। নিয়মিত নতুন নতুন বই ক্রয়ের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়ে চলছে পাঠাগারটি। এ ছাড়াও পাঠকের চাহিদা কে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় যদি কেউ নির্দিষ্ট কোনো বইয়ের জন্য অনুরোধ করেন তা পাঠাগার সংগ্রহ করে ঐ সদস্যকে প্রদান করার মাধ্যমে ব্যতিক্রমধর্মী সেবা প্রদান করে থাকে।
আমাদের দেশের দুর্বল অবকাঠামো বা পাঠাগারে আসার সহায়ক পরিবেশের অভাবে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পাঠাগারে আসতে পারে না, তাই তাদের জন্য মোবাইল লাইব্রেরি কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে। শুধু নারায়ণগঞ্জ সদর নয় বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল গুলোতে মোবাইল লাইব্রেরি সেবা প্রদান করে যাচ্ছে কোনরূপ সদস্য চাঁদা ছাড়া। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি এখনো বাচ্চাদের ভিতর বই পড়ার আগ্রহ অনেক। তাদের এই উদ্দীপনা আমাদেরকে আরো বেশি উদ্দীপ্ত করেছে মোবাইল লাইব্রেরি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য।
পাঠাগারের কার্যক্রম আরো প্রসারিত করার জন্য দূরবর্তী অঞ্চলে ভূইগড়ে অবস্থিত হাজী পান্দে আলী স্কুলের একটি কক্ষ নিয়ে গ্রন্থ সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। স্কুল পরিচালনা পর্ষদ কক্ষটি ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেন এবং এর পরিচালনা ও বই সংগ্রহ এবং সমস্ত ব্যয়ভার সুধীজন পাঠাগার বহন করে থাকে।
পাঠাগারে রক্ষিত সমস্ত বই আধুনিক গ্রন্থাগারের নিয়ম অনুসারে ডিউ ডেসিমেল পদ্ধতিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে কল নাম্বার প্রদান করা হয়েছে। ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকে আগত বিশেষজ্ঞ দল বই সংরক্ষণের ব্যবস্থাপনা দেখে প্রশংসা করেছে। বাংলাদেশে সুধীজন পাঠাগার প্রথম গণগ্রন্থাগার যার বই সংরক্ষণ আদান-প্রদান ও সদস্য ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয় নিজস্ব সফটওয়্যার এর মাধ্যেমে। রয়েছে মোবাইল অ্যাপ যার কারনে বাংলাদেশের গ্রন্থাগার আন্দোলনে সর্বকালের জন্য সুধীজন পাঠাগার পথিকৃৎ হয়ে থাকবে।
১৯৬৫ সালে সুধীজন পাঠাগার আয়োজিত সাত দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বইমেলা ছিল নারায়ণগঞ্জের একটি মাইলফলক। সেই ধারাবাহিকতায় আজও বিভিন্ন সময়ে আয়োজন করা হয় ট্যালেন্ট শো, বৈশাখী আড্ডা, চলচিত্র প্রদর্শন, সংগীতানুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাংকন ও শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর।
মেধা বিকাশের জন্য স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা হয় বই পড়া কার্যক্রম। এক্ষেত্রে পঠিত বই এর উপর বিভিন্ন প্রশ্ন দিয়ে মূল্যায়ন করা হয় তাদের বই পড়ার আগ্রহ। সেখান থেকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী কে পুরস্কার প্রদান করা হয়। শুধু তাই নয় মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সকলের জন্য থাকে প্রণোদনা উপহার। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে বাংলা বানান কর্মশালা, একুশে ফেব্রুয়ারির উপর কর্মশালা, সুন্দর হস্তাক্ষর কর্মশালা, আবৃত্তি কর্মশালা।
সুধীজন পাঠাগারের একটি সফল ও মর্যাদাপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে প্রকাশনা। কেননা প্রকাশনার মাধ্যেমে জ্ঞানকে সংরক্ষণ ও বিস্তার করা যায়। পাঠাগার কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থ “নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস” স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকসংষ্কৃতি, ব্যবসায়, মুক্তিয্দ্ধু, রাজনীতি, খেলাধুলা নিয়ে রচিত প্রথম ও অদ্বিতীয় একটি গ্রন্থ। ১০০ বছরের বাংলা সংষ্কৃতি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “বাংলা সংস্কৃতির শতবর্ষ” যা সকল মহলে প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়াও নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয় সুধী যার মাধ্যেমে স্থানীয় লেখক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা তাদের সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ পায়।
পাঠাগারে সুহৃদ ও গ্রন্থপ্রেমী বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের অর্থায়নে পরিচালিত হয় বেশ কিছু বৃত্তি, যা প্রদান করা হয় অসচ্ছল কিন্তু মেধাবী ছাত্র/ছাত্রীদেরকে। এই ক্ষেত্রে পাঠাগার শুধু উক্ত তহবিলের রক্ষক হিসবে কাজ করে। তহবিল থেকে আয় দিয়ে বৃত্তি হিসাবে প্রদান করে।
আধুনিক সুধীজন পাঠাগারের অন্যতম পরিকল্পনাকারী প্রয়াত হোসেন জামালের স্মরণে তার পরিবারের অর্থায়নে পরিচালিত তহবিলের আয় প্রদান করা হয় ঐ সমস্ত পাঠাগার সমূহকে যারা অর্থের অভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে না বা বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গকে যারা সরাসরি বই পড়া কার্যক্রম পরিচালনায় নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছেন।
পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মাধ্যক্ষ জনাব অধ্যাপক নুরুল হক সাহেবের অর্থায়নের পরিচালিত তহবিল থেকে প্রাপ্ত আয় প্রদান করা হয় বিভিন্ন গুণিজনকে যারা বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অবদান রেখে চলেছেন।
এভাবেই ১৯৬৪ সাল থেকে অদ্যাবধি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পাঠাগারের উন্নয়ন তথা নারায়ণগঞ্জের শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বই মানুষকে আলোকিত করে সেই আলোকময় পথে সুধীজন পাঠাগারের নিরন্তর পথ চলা।
স্কুলভিত্তিক বইপড়া প্রতিযোগিতা।
মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজন।
পঠিত বইয়ের উপর মূল্যায়ন।
২৭ জুন ২০২৬
৩০ এপ্রিল ২০২৬
৩১ মার্চ ২০২৬
বই মানুষের জীবন আলোকিত করে। আসুন পাঠাগারের সাথে যুক্ত হই।